পোরোর পায়ে ফাইনালের দরজা
ফুটবলে সব নায়ক গোল করার জন্য মাঠে নামেন না। কারও দায়িত্ব গোল ঠেকানো, কারও কাজ প্রতিপক্ষের পথ বন্ধ করা। কোনো কোনো রাতে দায়িত্বের সীমানা ভেঙে যায়। একজন ডিফেন্ডার হঠাৎ হয়ে ওঠেন গোলদাতা। একটি শট হয়ে ওঠে একটি দেশের স্বপ্নের ঠিকানা।
পেদ্রো পোরোর জীবনে সেই রাতটি এল বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে। প্রতিপক্ষ ফ্রান্স। স্কোরবোর্ডে তখন স্পেন ১, ফ্রান্স ০। ২২ মিনিটে পেনাল্টি থেকে মিকেল ওইয়ারসাবালের গোলে এগিয়ে গেছে স্পেন। একটি আক্রমণ, একটি ভুল, একটি মুহূর্ত সবকিছু বদলে দিতে পারে। স্পেন এগিয়ে ছিল, নিশ্চিন্ত ছিল না।
তারপর এল ৫৮ মিনিট। পেদ্রো পোরো। একটি গোল। স্কোরলাইন ২-০। সেই গোলের সঙ্গে স্পেনের সামনে খুলে গেল বিশ্বকাপ ফাইনালের দরজা। ফুটবলের ভাষায় সেটি একটি গোল। স্পেনের মানুষের কাছে স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস। বিশ্বকাপ ফাইনালের পথে শেষ বড় বাধাটি সরিয়ে দেওয়া এক মুহূর্ত।
পোরো গোল করলেন। দৌড়ালেন। সতীর্থরা ছুটে এলেন তার দিকে। গ্যালারি উঠে দাঁড়াল। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা স্পেনের সমর্থকেরা চিৎকার করে উঠলেন। সেই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে যেন পোরোর চোখের সামনে দিয়ে চলে গেল তার পুরো জীবন। ছোট শহর থেকে বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল। শৈশবের মাঠ থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফুটবলমঞ্চ। কত পথ! কত অপেক্ষা! কত লড়াই!
১৯৯৯ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর স্পেনের এক্সত্রেমাদুরার দন বেনিতোতে জন্ম পেদ্রো আন্তোনিও পোরো সাউসেদার। ছোটবেলায় তার পৃথিবী এত বড় ছিল না। ছিল পরিবার, পরিচিত রাস্তা, স্থানীয় মাঠ আর একটি ফুটবল। পৃথিবীর প্রায় সব বড় ফুটবলারের গল্পের শুরুতেই একটি ছোট মাঠ থাকে। সেখানে গ্যালারি নেই, ক্যামেরা নেই, কোটি মানুষের চোখ নেই। থাকে শুধু একটি শিশু আর তার স্বপ্ন।
পোরোর পথ কখনো সরল ছিল না। বয়সভিত্তিক ফুটবল পেরিয়ে পৌঁছান জিরোনায়। সেখান থেকেই পেশাদার ফুটবলের দরজা খুলতে শুরু করে। ম্যানচেস্টার সিটি তাঁকে দলে নেয়। সিটির হয়ে নিয়মিত মাঠে নামার সুযোগ হয়নি। ধারে খেলেছেন। নতুন ক্লাব, নতুন পরিবেশ, নতুন চ্যালেঞ্জ তাকে শিখিয়েছে অপেক্ষা করতে।
একজন ফুটবলারের জীবনে সব দরজা প্রথম ধাক্কাতেই খোলে না। কোনো কোনো দরজার সামনে বছরের পর বছর দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। পোরো দাঁড়িয়ে ছিলেন। তারপর স্পোর্টিং সিপিতে গিয়ে নিজেকে নতুন করে খুঁজে পেলেন।
পর্তুগালের ফুটবলে তার গতি, ক্রস, দূরপাল্লার শট এবং ডান প্রান্ত ধরে ছুটে চলার ক্ষমতা নজর কাড়ে। পোরো আধুনিক ফুটবলের সেই প্রজাতির ডিফেন্ডার, যারা নিজেদের অর্ধে প্রতিপক্ষকে থামিয়ে পরের মুহূর্তেই আক্রমণের অংশ হয়ে যান। নিজের বক্স থেকে প্রতিপক্ষের বক্স পুরো ডান প্রান্তটাই তার কর্মক্ষেত্র।
স্পোর্টিংয়ের পর আসে টটেনহাম হটস্পারের অধ্যায়। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের গতি, শক্তি ও নিরন্তর লড়াই তাঁকে আরও পরিণত করেছে। তার ফুটবলের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য সাহস। সামনে যেতে ভয় পান না। সুযোগ পেলে ক্রস করেন, দূর থেকে শট নেন, আবার বল হারালে ফিরে আসেন নিজের জায়গায়। পোরো নতুন যুগের ফুলব্যাক।
বিশ্বকাপে একটি ভুলের পর কখনো অপেক্ষা করতে হয় চার বছর। আর সেমিফাইনালে প্রতিটি স্পর্শের সঙ্গে ইতিহাস হাঁটে। ফ্রান্সের বিপক্ষে সেই ম্যাচেও ইতিহাস স্পেনের পাশে হাঁটছিল। ২০১০ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর আবার ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন। নতুন প্রজন্ম। নতুন মুখ। নতুন গল্প। ২২ মিনিটে ওইয়ারসাবালের পেনাল্টি থেকে গোল। ১-০। ফ্রান্স থামার দল নয়।
তাদের প্রতিটি আক্রমণের সঙ্গে স্পেনের সমর্থকদের বুক কেঁপেছে। তারপর ৫৮ মিনিটে পোরোর মুহূর্ত। ডিফেন্ডার হয়েও তিনি পৌঁছে গেলেন সেই জায়গায়, যেখানে একটি সুযোগ ইতিহাস হয়ে উঠতে পারে। তারপর গোল। ২-০।
পোরো জীবনে আরও গোল করেছেন, আরও করবেন। সব গোলের ওজন সমান নয়। এই গোলটি স্পেনের ফুটবল ইতিহাসে জায়গা করে নেয়। এরপর ফ্রান্স চেষ্টা করেছে। স্পেন লড়েছে। ঘড়ির কাঁটা যেন সমর্থকদের সঙ্গে খেলা করেছে। ৬০ মিনিট। ৭০। ৮০। ৯০। তারপর শেষ বাঁশি। ফ্রান্স ০, স্পেন ২।
বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেন।গ্যালারিতে পতাকা উড়ছে। কেউ হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছেন, কেউ সতীর্থকে জড়িয়ে ধরেছেন। সেই ছবির ভেতরে দাঁড়িয়ে পেদ্রো পোরো। দন বেনিতোর ছোট্ট পৃথিবীতে বলের পেছনে ছুটে বেড়ানো ছেলেটি এখন বিশ্বকাপ ফাইনালিস্ট।
৫৮ মিনিট হয়তো একটি সংখ্যা মাত্র। একজন ফুটবলারের জীবনে কিছু সংখ্যা আর কখনো সাধারণ থাকে না। পোরোর জন্য ৫৮ এখন স্মৃতি। স্পেনের জন্য স্বস্তি। বিশ্বকাপের জন্য একটি গল্প। প্রথম গোলটি করেছিলেন ওইয়ারসাবাল। শেষ নিশ্চয়তার সিলমোহরটি দিলেন পোরো।
সময় চলে যাবে। বিশ্বকাপ শেষ হবে। নতুন মৌসুম আসবে। নতুন গোল জন্ম নেবে। কিন্তু স্পেনের ফুটবল ইতিহাসের একটি পাতায় লেখা থাকবে ৫৮ মিনিটে বলটি জালে জড়িয়েছিলেন পেদ্রো পোরো। সেই গোলেই খুলেছিল ফাইনালের দরজা।

